দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ: কোরআন-হাদিসের আলোকে ৭টি বিষয়

আমরা অনেকেই দিনের পর দিন একই দোয়া করে যাই, কিন্তু মনে হয় কোনো সাড়া পাচ্ছি না। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, আমার দোয়া কি কবুল হচ্ছে না? কেন হচ্ছে না? কোরআন ও হাদিসে এ বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা আছে। এই লেখায় আমরা জানব দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ কী কী, আর কোন আমলগুলো দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

আল্লাহ কি সবার দোয়া শোনেন?

প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া শোনেন এবং সাড়া দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সুরা গাফির, আয়াত ৬০)। আরেক জায়গায় বলেছেন, “আমি আহ্বানকারীর আহ্বানে সাড়া দিই, যখন সে আমাকে ডাকে।” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)

তবে সাড়া দেওয়া মানেই সব সময় হুবহু চাওয়া জিনিসটি সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম যখন এমন দোয়া করে যাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কিছু নেই, আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দেন: হয় দ্রুত তার চাওয়া পূরণ করেন, নয়তো আখিরাতের জন্য তা জমা রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে দূর করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ)

অর্থাৎ, দোয়া কখনো বৃথা যায় না।

দোয়া কবুল না হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

১. হারাম উপার্জন ও হারাম খাবার

দোয়া কবুলের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হারাম রিজিক। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুল (সা.) এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত, চুল এলোমেলো, ধুলোমাখা শরীরে আকাশের দিকে হাত তুলে “হে রব, হে রব” বলে ডাকছে। কিন্তু তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম, হারাম দিয়েই সে লালিত। রাসুল (সা.) বললেন, তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫)

আরও পড়ুন: হাই তোলা সম্পর্কে ইসলাম কী বলে? কোরআন ও হাদিসের আলোকে সঠিক নিয়ম

তাই ঘুষ, সুদ, প্রতারণা বা অন্যের হক মেরে উপার্জন থেকে দূরে থাকা দোয়া কবুলের প্রথম শর্ত।

২. তাড়াহুড়া করা ও হতাশ হয়ে দোয়া ছেড়ে দেওয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের দোয়া কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, আমি দোয়া করেছি কিন্তু কবুল হলো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৩৫)

অনেকে কয়েক দিন দোয়া করে ফল না পেয়ে হাল ছেড়ে দেন। অথচ ধৈর্য ধরে দোয়া চালিয়ে যাওয়াটাই আসল।

৩. গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নের দোয়া

কারও ক্ষতি চাওয়া, অন্যায় কোনো কাজে সফলতা চাওয়া বা আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার দোয়া কবুল হয় না। ওপরের হাদিসের সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এই শর্তটি স্পষ্টভাবে এসেছে।

৪. উদাসীন মন নিয়ে দোয়া করা

মুখে দোয়া পড়ছি কিন্তু মন অন্য কোথাও, এমন দোয়ার ব্যাপারে রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করো, আর জেনে রাখো, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দোয়া কবুল করেন না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৩৪৭৯)

৫. দ্বিধা নিয়ে চাওয়া

“হে আল্লাহ, তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো” এভাবে শর্ত দিয়ে দোয়া করতে রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, দৃঢ়তার সঙ্গে চাইবে, কারণ আল্লাহকে বাধ্য করার মতো কেউ নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৩৯)

৬. ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা না দেওয়া

সমাজে অন্যায় দেখেও চুপ থাকার ব্যাপারে হাদিসে সতর্কবাণী আছে যে, এমন হলে আল্লাহ শাস্তি পাঠাতে পারেন, তখন মানুষ দোয়া করবে কিন্তু কবুল হবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২১৬৯)

৭. ফরজ ইবাদতে অবহেলা

নামাজ, রোজার মতো ফরজ ইবাদত ছেড়ে দিয়ে শুধু বিপদে পড়লে দোয়া করা, আর সুসময়ে আল্লাহকে ভুলে থাকা, এই অভ্যাস আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। সুসময়ে আল্লাহকে স্মরণ করলে দুঃসময়ে তিনি স্মরণ করেন।

দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বাড়ায় যে আমলগুলো

  • দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ: প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা, তারপর রাসুল (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়ে দোয়া করা উত্তম।
  • শেষ রাতে দোয়া: রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়া দেন বলে হাদিসে এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ১১৪৫)
  • সিজদায় দোয়া: বান্দা সিজদার সময় তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, তাই সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করতে বলা হয়েছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৮২)
  • আজান ও ইকামতের মাঝের সময়: এই সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না বলে হাদিসে বর্ণিত আছে। (সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি)
  • জুমার দিন: জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন দোয়া কবুল হয়।
  • গোপনে ও বিনয়ের সঙ্গে দোয়া: কান্নাভেজা মন নিয়ে নিচু স্বরে আল্লাহকে ডাকা।
  • তওবা ও ইস্তিগফার: গুনাহ থেকে ফিরে আসা দোয়া কবুলের পথ পরিষ্কার করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

দোয়া কবুল হয়েছে কি না বোঝার উপায় কী?

সব সময় সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। কখনো চাওয়া জিনিস পাওয়া যায়, কখনো এর চেয়ে ভালো কিছু আসে, আবার কখনো বিপদ দূর হয় বা আখিরাতের জন্য জমা থাকে। তাই হতাশ না হয়ে দোয়া চালিয়ে যাওয়াই নিয়ম।

বাংলায় দোয়া করলে কি কবুল হয়?

হ্যাঁ। নামাজের বাইরে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে মন খুলে চাওয়া যায়। আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন।

একই দোয়া বারবার করা কি ঠিক?

অবশ্যই। বারবার চাওয়া আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় এবং এটি বান্দার আন্তরিকতার প্রকাশ।

শেষ কথা

দোয়া মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। দোয়া কবুল না হওয়ার কারণগুলো জেনে নিজেকে শুধরে নিলে, হালাল রিজিক, মনোযোগী অন্তর আর ধৈর্য নিয়ে দোয়া করলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ সাড়া দেবেন। ইবাদত কবুলের শর্তগুলো জানতে পড়ুন: ইবাদত কবুলের ৪ শর্ত ও ৮টি লক্ষণ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: যেকোনো মাসআলায় বিস্তারিত জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top