প্রতিদিন আমরা কতবার ঘর থেকে বের হই—অফিস, স্কুল, বাজার, মসজিদ বা কারও বাসায়। এই ছোট মুহূর্তটাকেও ইসলাম আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া খুবই ছোট, মুখস্থ করতে এক মিনিটও লাগে না, অথচ হাদিসে এর বড় ফজিলতের কথা এসেছে। চলুন জেনে নিই দোয়াটির আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও পড়ার নিয়ম।
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
প্রথম দোয়া (সবচেয়ে প্রচলিত)
بِسْمِ اللَّهِ، تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
বাংলা উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর নামে (বের হচ্ছি)। আল্লাহর ওপর ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৫; জামে তিরমিযি, হাদিস ৩৪২৬।
দ্বিতীয় দোয়া
উম্মুল মুমিনিন উম্মে সালামা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই তাঁর ঘর থেকে বের হতেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে এই দোয়া পড়তেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা আন আদিল্লা আও উদাল্লা, আও আযিল্লা আও উযাল্লা, আও আযলিমা আও উযলামা, আও আজহালা আও ইউজহালা আলাইয়া।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই—যেন আমি পথভ্রষ্ট না হই বা আমাকে পথভ্রষ্ট করা না হয়; আমি পদস্খলিত না হই বা আমাকে পদস্খলিত করা না হয়; আমি কারও ওপর জুলুম না করি বা আমার ওপর জুলুম করা না হয়; আমি কারও সঙ্গে মূর্খের মতো আচরণ না করি বা আমার সঙ্গে কেউ এমন আচরণ না করে।
সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০৯৪।
বাংলা উচ্চারণ দিয়ে আরবির হুবহু উচ্চারণ পুরোপুরি ধরা যায় না। তাই সম্ভব হলে কোনো আলেম বা কোরআন পড়তে জানা কারও কাছ থেকে আরবি উচ্চারণ শুনে শিখে নিন।
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়ার ফজিলত
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেউ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় প্রথম দোয়াটি পড়লে তাকে বলা হয়—তুমি হিদায়াত পেলে, তোমার জন্য যথেষ্ট করা হলো এবং তোমাকে রক্ষা করা হলো; আর শয়তান তার কাছ থেকে সরে যায়। (আবু দাউদ ৫০৯৫; তিরমিযি ৩৪২৬)
এই হাদিস থেকে তিনটি বড় প্রাপ্তির কথা জানা যায়:
| হাদিসে যা বলা হয়েছে | সহজ ভাষায় |
|---|---|
| হিদায়াত পাওয়া | সঠিক পথে চলার তাওফিক |
| যথেষ্ট হওয়া | প্রয়োজন পূরণে আল্লাহর সাহায্য |
| রক্ষা পাওয়া | অনিষ্ট থেকে হেফাজত |
দোয়াটির মূল কথা হলো আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল)। কোরআনে আল্লাহ বলেন, “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক, আয়াত ৩)
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া পড়ার নিয়ম
- ঘরের দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় বা বের হয়েই দোয়াটি পড়ুন।
- প্রথম দোয়াটি প্রতিবার পড়ার চেষ্টা করুন। সময় থাকলে দ্বিতীয়টিও পড়ুন।
- অর্থ মনে রেখে পড়ুন, তাহলে মনে ভরসা ও প্রশান্তি আসবে।
- পরিবারের ছোটদেরও শিখিয়ে দিন। স্কুলে যাওয়ার সময় একসঙ্গে পড়ার অভ্যাস করাতে পারেন।
- দোয়া পড়ে ভরসা রাখার পাশাপাশি সাবধানতাও মেনে চলুন—দরজা লাগানো, রাস্তা পার হওয়ার নিয়ম ইত্যাদি। তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়।
দোয়া দুটি থেকে আমাদের শিক্ষা
প্রথম দোয়ায় আমরা শিখি, যেকোনো কাজ শুরুর আগে আল্লাহর নাম নেওয়া এবং নিজের শক্তির ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। দ্বিতীয় দোয়াটি আরও গভীর। এখানে শুধু নিজের ক্ষতি থেকে নয়, অন্যের ক্ষতি করা থেকেও আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ঘর থেকে বের হয়ে আমি যেন কারও ওপর অন্যায় না করি, কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করি—এই সচেতনতাও দোয়ার অংশ।
রাস্তায়, অফিসে বা বাজারে প্রতিদিন নানা মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। রাগ, তর্ক, প্রতারণা বা ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি সব জায়গায় থাকে। দিনের শুরুতেই এই দোয়া মনে করিয়ে দেয়, আমার আচরণও যেন সুন্দর থাকে।
ঘরে প্রবেশের সময় কী করবেন?
বের হওয়ার মতো ঘরে ঢোকার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করার কথা হাদিসে এসেছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, কেউ ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাওয়ার সময় আল্লাহর নাম নিলে শয়তান তার সঙ্গীদের বলে, এখানে তোমাদের রাত কাটানোর জায়গা নেই, রাতের খাবারও নেই। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০১৮)
তাই ঘরে ঢোকার সময় “বিসমিল্লাহ” বলুন এবং ঘরের লোকজনকে সালাম দিন। কোরআনেও ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়ার নির্দেশনা আছে। (সুরা আন-নুর, আয়াত ৬১)
প্রতিদিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া জানতে পড়ুন ওযুর পরের দোয়া: আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ ও ফজিলত।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া কি জোরে পড়তে হয়?
জোরে পড়ার কোনো শর্ত নেই। নিচু স্বরে বা মনে মনে ঠোঁট নেড়ে পড়লেই চলে।
দোয়া ভুলে গেলে কী করব?
মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে নিন। আর অভ্যাস গড়তে দরজার পাশে দোয়াটি লিখে রাখতে পারেন।
অফিস বা দোকান থেকে বের হওয়ার সময়ও কি এই দোয়া পড়া যায়?
হাদিসে নিজের ঘর থেকে বের হওয়ার কথা এসেছে। অন্য জায়গা থেকে বের হওয়ার সময় পড়া যাবে কি না, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন। তবে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা যেকোনো সময় স্মরণ করা যায়।
দোয়া পড়লে কি আর বিপদ হবে না?
দোয়া আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। ফলাফল আল্লাহর হাতে। দোয়া কেন কখনো দেরিতে কবুল হয় বা কবুল হয় না, তা নিয়ে লিখেছি দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ লেখায়।
শেষ কথা
ঘর থেকে বের হওয়ার দোয়া ছোট্ট একটি আমল, কিন্তু প্রতিদিনের প্রতিটি যাত্রাকে আল্লাহর ভরসায় শুরু করতে শেখায়। আজ থেকেই দোয়াটি মুখস্থ করে নিন এবং পরিবারকেও শেখান।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এখানে দেওয়া হাদিসের সূত্র প্রচলিত নম্বর অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে; সংস্করণভেদে নম্বর কিছুটা আলাদা হতে পারে। দোয়ার সঠিক উচ্চারণ ও মাসআলা-সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্নে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।