ভোটার আইডি কার্ড হারিয়ে গেলে করণীয়: জিডি ও রিইস্যুর নিয়ম

মানিব্যাগ হারিয়ে গেল, আর তার সাথে চলে গেল জাতীয় পরিচয়পত্রটাও। ব্যাংক, সিম, পাসপোর্ট থেকে শুরু করে প্রায় সব কাজেই এখন এনআইডি লাগে, তাই দুশ্চিন্তা হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ভোটার আইডি কার্ড হারিয়ে গেলে করণীয় খুব জটিল কিছু নয়। থানায় একটি জিডি আর অনলাইনে একটি আবেদন করলেই নতুন কার্ড পাওয়া যায়, এমনকি ঘরে বসেই অনলাইন কপি নামিয়ে আপাতত কাজ চালানো যায়।

নিচে পুরো প্রক্রিয়াটা ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

ভোটার আইডি কার্ড হারিয়ে গেলে প্রথমে কী করবেন

কার্ড হারানোর পর প্রথম কাজ হলো থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা। জিডি ছাড়া হারানো কার্ডের রিইস্যু আবেদন করা যায় না, কারণ আবেদনের সময় জিডির নম্বর, তারিখ ও থানার নাম দিতে হয় এবং জিডির কপি আপলোড করতে হয়।

জিডি দুইভাবে করতে পারেন:

  • থানায় গিয়ে: যে এলাকায় কার্ড হারিয়েছে, সেখানকার থানায় গিয়ে লিখিতভাবে জানান।
  • অনলাইনে: বাংলাদেশ পুলিশের অনলাইন জিডি সেবা (gd.police.gov.bd) বা তাদের অ্যাপ থেকে হারানো জিনিসের জিডি করা যায়।

জিডিতে আপনার নাম, এনআইডি নম্বর (জানা থাকলে), কোথায় ও কখন হারিয়েছে তা উল্লেখ করুন। জিডির কপি যত্ন করে রেখে দিন।

এনআইডি নম্বর মনে না থাকলে কী করবেন

অনেকে কার্ডের নম্বর মুখস্থ রাখেন না। খুঁজে দেখুন, আগে কোথাও কার্ডের ফটোকপি, ছবি বা ব্যাংক-সিমের কাগজে নম্বরটি আছে কি না। না পেলে নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইন ১০৫ নম্বরে ফোন করে বা উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে সহায়তা নিতে পারেন।

আবেদনের আগে যা যা হাতের কাছে রাখবেন

আবেদন শুরু করার আগে নিচের জিনিসগুলো গুছিয়ে নিলে মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝামেলা থাকবে না:

  • এনআইডি নম্বর বা ভোটার নিবন্ধনের ফরম নম্বর
  • জন্মতারিখ, যা কার্ডে লেখা ছিল ঠিক সেভাবে
  • জিডির নম্বর, তারিখ ও থানার নাম
  • জিডির কপির স্পষ্ট ছবি বা স্ক্যান, যাতে লেখা পরিষ্কার পড়া যায়
  • নিজের নামে নিবন্ধিত একটি সচল মোবাইল নম্বর
  • ফি পরিশোধের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা
  • ফেস ভেরিফিকেশনের জন্য ক্যামেরা ভালো এমন একটি স্মার্টফোন

জিডির কপির ছবি বেশি বড় হলে আপলোডে সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে ছবি বা পিডিএফের সাইজ একটু কমিয়ে নিন।

অনলাইনে রিইস্যু আবেদনের নিয়ম: ধাপে ধাপে

নতুন কার্ডের আবেদন করতে হয় নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল সাইট services.nidw.gov.bd থেকে।

  1. সাইটে ঢুকে এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও ক্যাপচা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করুন।
  2. বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার তথ্য দিন। আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি আসবে, সেটি বসান।
  3. এরপর NID Wallet অ্যাপ দিয়ে ফেস ভেরিফিকেশন করতে হয়। প্লে স্টোর থেকে অ্যাপটি নামিয়ে নির্দেশনা অনুযায়ী মুখের ছবি স্ক্যান করুন।
  4. অ্যাকাউন্ট খোলা হলে লগইন করে ড্যাশবোর্ডে রিইস্যু অপশন বেছে নিন।
  5. কারণ হিসেবে “হারিয়ে গেছে” নির্বাচন করুন এবং জিডি নম্বর, থানার নাম ও জিডির তারিখ লিখুন।
  6. মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন বিকাশ, রকেট) বা নির্ধারিত অন্য মাধ্যমে ফি পরিশোধ করুন।
  7. জিডির স্ক্যান কপি আপলোড করে আবেদন জমা দিন। আবেদন ট্র্যাক করার তথ্য সংরক্ষণ করুন।

রিইস্যু ফি কত লাগে

ফি নির্ভর করে আপনি কততম বার রিইস্যু করছেন এবং সাধারণ নাকি জরুরি সেবা নিচ্ছেন তার ওপর। বিভিন্ন সূত্রে প্রচলিত হার মোটামুটি এরকম:

রিইস্যুর ধাপ সাধারণ জরুরি
প্রথমবার ২৩০ টাকা ৩৪৫ টাকা
দ্বিতীয়বার ৩৪৫ টাকা ৫৭৫ টাকা
তৃতীয় বা তার বেশি আরও বেশি, সাইটে দেখে নিন

দ্রষ্টব্য: ফি ও ডেলিভারির সময় সরকার যেকোনো সময় পরিবর্তন করতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পরিশোধ করলে সার্ভিস চার্জও যোগ হতে পারে। আবেদনের সময় services.nidw.gov.bd-তে দেখানো ফি-ই চূড়ান্ত ধরে নিন।

নতুন কার্ড আসার আগে কাজ চালাবেন কীভাবে

রিইস্যু আবেদনের পর নতুন কার্ড হাতে পেতে কিছুদিন সময় লাগে। জরুরি সেবা নিলে তুলনামূলক দ্রুত পাওয়া যায়। এর মধ্যে অনলাইন অ্যাকাউন্টে লগইন করে এনআইডির ডিজিটাল কপি ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে রাখতে পারেন, যা অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে কাজে লাগে। কার্ড প্রস্তুত হলে মোবাইলে এসএমএস আসে, তারপর নির্দিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে সংগ্রহ করতে হয়।

কিছু জরুরি পরামর্শ

  • এনআইডির কাজে দালাল বা অচেনা ফেসবুক পেজে টাকা পাঠাবেন না। শুধু অফিশিয়াল সাইট ব্যবহার করুন।
  • যে মোবাইল নম্বর দিয়ে আবেদন করবেন, সেটা যেন আপনার নিজের ও সচল থাকে।
  • নতুন কার্ড পাওয়ার পর একটি ছবি বা ফটোকপি নিরাপদ জায়গায় রেখে দিন।
  • হারানো কার্ড দিয়ে কেউ সিম বা অন্য কিছু তুলেছে বলে সন্দেহ হলে জিডির কপি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করুন।

সন্তানের বা নিজের জন্ম নিবন্ধনের তথ্য মিলিয়ে নিতে পড়ুন অনলাইন জন্ম নিবন্ধন যাচাই করার নিয়ম। আর এনআইডি হাতে পেলে পাসপোর্টের আবেদন করতে চাইলে দেখুন পাসপোর্ট করার নিয়ম।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

জিডি ছাড়া কি হারানো ভোটার আইডি কার্ড তোলা যায়?

না। হারানো কার্ডের রিইস্যু আবেদনে জিডির তথ্য ও কপি দিতে হয়, তাই আগে জিডি করে নিতে হবে।

নতুন করে ছবি বা আঙুলের ছাপ দিতে হবে কি?

সাধারণত শুধু হারানো কার্ড রিইস্যুর জন্য নতুন করে ছবি বা আঙুলের ছাপ দিতে হয় না, কারণ আপনার তথ্য আগেই সার্ভারে থাকে। তবে অনলাইন অ্যাকাউন্ট খুলতে ফেস ভেরিফিকেশন লাগে।

নিজের মোবাইল দিয়ে কি পুরো আবেদন করা যায়?

হ্যাঁ। জিডি থেকে শুরু করে রিইস্যু আবেদন ও ফি পরিশোধ, সবই স্মার্টফোন দিয়ে করা যায়।

ভোটার আইডি কার্ড হারিয়ে গেলে করণীয় নিয়ে কোথায় সাহায্য পাব?

নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইন ১০৫ নম্বরে ফোন করতে পারেন, অথবা নিজ উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

শেষ কথা

ভোটার আইডি কার্ড হারিয়ে গেলে করণীয় মূলত তিনটি: দ্রুত জিডি করা, services.nidw.gov.bd থেকে রিইস্যুর আবেদন করা, আর নতুন কার্ড না আসা পর্যন্ত ডিজিটাল কপি দিয়ে কাজ চালানো। ঘাবড়ে না গিয়ে ধাপগুলো মেনে চললে কয়েক দিনের মধ্যেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Scroll to Top