২০২৭ সালের পাঠ্যবই প্রস্তুতিতে কোন স্তরে কতটা অগ্রগতি

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যে বই পৌঁছে দেওয়া শিক্ষা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। ২০২৭ সালের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতি মাধ্যমিকের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। তবে বিশেষ করে নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহের হার কম থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপানো হয়েছে। বাঁধাই, কাটিং ও প্রাক্-সরবরাহ পরিদর্শন শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৭৪ শতাংশ বই। অন্যদিকে, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের প্রায় অর্ধেক ছাপা শেষ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে সরবরাহ করা হয়েছে ৪০ শতাংশ।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই ছাপার অগ্রগতিতে পার্থক্য
দুই স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের পরিসংখ্যানের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে ছাপার কাজ তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বইয়ের কাজ বাকি। আর নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহের অগ্রগতি প্রায় ৩ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বই ছাপা শেষ হওয়া এবং শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছানো এক বিষয় নয়। ছাপার পর বাঁধাই, কাটিং, মান যাচাই ও সরবরাহের মতো ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে শুধু মুদ্রণের হার দিয়ে পুরো বিতরণপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি বোঝা যায় না।
আরও পড়ুন: এসএসসি-এইচএসসি পড়াশোনায় এআই ব্যবহারের ৭টি কার্যকর উপায়
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে কত বই ছাপা হচ্ছে
এনসিটিবির সূত্র অনুযায়ী, আসন্ন শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য মোট প্রায় ৩১ কোটি বই প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের উপযোগী বই এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বইও রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার। মাধ্যমিক স্তরের জন্য ছাপা হচ্ছে ২২ কোটির বেশি বই। সব মিলিয়ে এই কার্যক্রমে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
বিপুলসংখ্যক বই নির্ধারিত সময়ে প্রস্তুত ও বিতরণ করতে মুদ্রণ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ে সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। কোনো একটি ধাপে বিলম্ব হলে পরবর্তী ধাপেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
চারটি নতুন বইয়ের অনুমোদন নিয়ে অপেক্ষা
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যক্রমে নতুন চারটি বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বইগুলোর ছাপার কার্যাদেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বইগুলোর নাম হলো:
- চতুর্থ শ্রেণি: বাংলাদেশের সংস্কৃতি, খেলাধুলা
- ষষ্ঠ শ্রেণি: আমার কারিগরি শিক্ষা, আনন্দময় শিক্ষা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভায় বইগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। অনুমোদন মিললে ছাপার কার্যাদেশ দেওয়া হতে পারে। সভার সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী কার্যাদেশের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বইগুলোকে অনুমোদিত বা ছাপার কাজ শুরু হয়েছে—এমনভাবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
আরও পড়ুন: তেজপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা
পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস ও বিষয়বস্তুতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা
আসন্ন শিক্ষাবর্ষের বইয়ে ইতিহাসসহ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনার উদ্যোগের কথা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পাঠ্যবইয়ের বর্ণনাতেও পরিবর্তনের উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে।
ইতিহাস ও জাতীয় ঘটনাবলি পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক দলিল এবং ভারসাম্যপূর্ণ ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রস্তাবিত পরিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ জানতে সংশোধিত পাঠ্যবই ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেখা প্রয়োজন।
জানুয়ারিতে সব শিক্ষার্থী বই পাবে কি
এনসিটিবির লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করে সেগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানো। বোর্ডের পাঠ্যপুস্তক বিভাগের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসেরের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।
তবে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং বাস্তবে সব বই বিতরণ সম্পন্ন হওয়া এক নয়। কিছু মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় পিছিয়ে পড়তে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের অগ্রগতি পরবর্তী সময়ে কত দ্রুত বাড়ে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আগের বছরগুলোর অভিজ্ঞতা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সরকার ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্যবই দিয়ে আসছে। তবে বিভিন্ন বছরে শিক্ষাবর্ষ শুরুর পরও কিছু শিক্ষার্থীর হাতে সব বই পৌঁছাতে দেরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে শতভাগ বই সরবরাহ সম্পন্ন করতে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লেগেছিল। শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় এক মাস সাত দিন পর এই অগ্রগতি অর্জিত হয়। তার আগের বছরে সব বই সরবরাহ করতে প্রায় তিন মাস লেগেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বই পেতে দেরি হলে শিক্ষার্থীদের পাঠপরিকল্পনা ও শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই এবার শুধু ছাপার কাজ শেষ করাই নয়, সময়মতো বই সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য এর অর্থ কী
২০২৭ সালের পাঠ্যবই সময়মতো হাতে পাওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বছরের শুরুতেই প্রয়োজনীয় বই পাওয়া গেলে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও বাড়িতে পড়াশোনার পরিকল্পনা সহজ হয়। বিপরীতে, কোনো শ্রেণির বই দেরিতে পৌঁছালে একই সময়ে সব বিষয় পড়ানো ও শেখার ক্ষেত্রে অসুবিধা তৈরি হতে পারে।
নতুন বই যুক্ত হলে সেগুলোর অনুমোদন, মুদ্রণ এবং সরবরাহের সময়সূচিও নজরে রাখতে হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বই সঠিকভাবে প্রস্তুত ও বিতরণ করাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- মোট বই: প্রায় ৩১ কোটি
- সম্ভাব্য ব্যয়: প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা
- প্রাথমিক স্তরে ছাপা: ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ৮৬ শতাংশের বেশি
- প্রাথমিক স্তরে সরবরাহ: ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৪ শতাংশ
- মাধ্যমিক স্তরে ছাপা: ২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফার দরপত্রভুক্ত বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ
- মাধ্যমিক স্তরে সরবরাহ: সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে প্রায় ৪০ শতাংশ
- নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহ: প্রায় ৩ শতাংশ
- নতুন বই: চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য মোট চারটি প্রস্তাবিত বই
- ছাপা শেষ করার লক্ষ্য: ৩০ নভেম্বর
- বিতরণের লক্ষ্য: জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া
উল্লেখিত অগ্রগতির হার নির্দিষ্ট তারিখভিত্তিক। পরবর্তী সময়ে এসব পরিসংখ্যান পরিবর্তিত হতে পারে।
সামনে কী দেখার বিষয়
আগামী দিনে বই ছাপার গতি, সরবরাহের অগ্রগতি এবং নতুন চারটি বইয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে ইতিহাস ও বাংলা বইয়ে প্রস্তাবিত পরিবর্তনের চূড়ান্ত বিষয়বস্তু প্রকাশিত হলে তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
এনসিটিবির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী কাজ এগোলে জানুয়ারিতে বই বিতরণের লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ফল নির্ভর করবে মুদ্রণ শেষ করা, মান যাচাই, পরিবহন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বই পৌঁছানোর ওপর।
FAQ: ২০২৭ সালের পাঠ্যবই নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
১. ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মোট কতটি বই ছাপা হচ্ছে?
এনসিটিবির সূত্র অনুযায়ী, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর কাজ চলছে।
২. প্রাথমিক স্তরের বই ছাপার অগ্রগতি কত?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপা হয়েছে এবং ৭৪ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে।
৩. মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের অগ্রগতি কেমন?
২১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম দফায় দরপত্র হওয়া মাধ্যমিক বইয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ ছাপা হয়েছে এবং প্রায় ৪০ শতাংশ সরবরাহ করা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির বই সরবরাহের অগ্রগতি প্রায় ৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে কোন নতুন বই যুক্ত হওয়ার কথা?
চতুর্থ শ্রেণিতে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
৫. কবে নাগাদ বই ছাপা শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে?
এনসিটিবির লক্ষ্য ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ছাপার কাজ শেষ করে বই মাঠপর্যায়ে পাঠানো।
৬. শিক্ষার্থীরা জানুয়ারিতে সব বই পাবে কি?
কর্তৃপক্ষ জানুয়ারিতে বই পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। তবে সব শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো বই পৌঁছানো নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সর্বশেষ সরবরাহের তথ্য প্রয়োজন।
উপসংহার
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই প্রস্তুতিতে প্রাথমিক স্তর তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক স্তরে কাজ শেষ করার চাপ রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন চারটি বইয়ের অনুমোদন এবং ইতিহাসসংক্রান্ত বিষয়বস্তুর পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ছাপা, মান যাচাই ও সরবরাহের কাজ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতেই প্রয়োজনীয় বই পেতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য এনসিটিবির পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা জরুরি।