আখেরি চাহার সোম্বা কী?
হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ বলা হয়। ‘আখেরি’ ফারসি শব্দ, যার অর্থ শেষ; আর ‘চাহার সোম্বা’ বলতে বোঝায় বুধবার। আখেরি চাহার সোম্বা কী—এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজের একটি অংশ এই দিনটিকে রাসূলুল্লাহ হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অসুস্থতার সময় সাময়িক সুস্থতা অনুভব করার সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। তবে এই দিনের নির্দিষ্ট ফজিলত বা বিশেষ ধর্মীয় আমল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হাদিসে স্পষ্ট প্রমাণ আছে কি না, তা নিয়ে ইসলামি আলেম ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অন্যদিকে, সহিহ হাদিসে রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা, নামাজ এবং শেষ জীবনের বিভিন্ন ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আখেরি চাহার সোম্বা কেন পালন করা হয়?

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, রাসূল (সা.)-এর জীবনের শেষ দিকে অসুস্থতার মধ্যে কোনো এক বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। সেই ঘটনাকে স্মরণ করে কিছু মুসলমান দান-সদকা, নফল ইবাদত, দরুদ পাঠ বা অন্যান্য ধর্মীয় আমল করে থাকেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সফর মাসের শেষ বুধবারেই রাসূল (সা.) সুস্থ হয়েছিলেন—এমন নির্দিষ্ট তারিখের প্রমাণ সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না।
রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার সময় তিনি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে নামাজের জন্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেও কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সহিহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় এ ঘটনা বিস্তারিতভাবে এসেছে।
আরও পড়ুন: কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা সম্পর্কে কী জানা যায়?
রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ সময়ে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় তিনি নামাজের বিষয়ে বারবার খোঁজ নিতেন এবং সাহাবিদের নামাজ আদায়ের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতেন।
এক পর্যায়ে আবু বকর (রা.)-কে জামাতে ইমামতি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, শেষ অসুস্থতার সময় আবু বকর (রা.) মুসল্লিদের নামাজ পড়াতেন। মৃত্যুর দিন সোমবার রাসূল (সা.) পর্দা সরিয়ে সাহাবিদের নামাজরত অবস্থায় দেখেছিলেন। এরপর সেদিনই তাঁর ইন্তেকাল হয়।
আরেকটি সহিহ বর্ণনায় দেখা যায়, অসুস্থতার মধ্যে কিছুটা স্বস্তি পেলে রাসূল (সা.) দুই ব্যক্তির সহায়তায় মসজিদের দিকে গিয়েছিলেন এবং আবু বকর (রা.)-এর পাশে বসে নামাজ আদায় করেছিলেন।
রাসূল (সা.)-এর অসুখের নাম কী ছিল?
রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতাকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট রোগের নাম দিয়ে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। প্রামাণ্য হাদিসে তাঁর অসুস্থতার বিভিন্ন শারীরিক অবস্থা ও কষ্টের কথা পাওয়া যায়, কিন্তু আধুনিক রোগ নির্ণয়ের মতো কোনো নির্দিষ্ট মেডিকেল ডায়াগনসিস দেওয়া হয়নি।
সহিহ বুখারির একটি বর্ণনায় রাসূল (সা.) তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় খায়বারের খাবারের বিষক্রিয়ার পুরোনো প্রভাবজনিত ব্যথার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এটিকে তাঁর শেষ অসুস্থতার একমাত্র বা নিশ্চিত চিকিৎসাগত কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
অসুস্থতার সময় তাঁর শারীরিক দুর্বলতাও ছিল গুরুতর। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, তিনি নামাজের জন্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করার সময় অসুস্থতার কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
আখেরি চাহার সোম্বার সঙ্গে রাসূল (সা.)-এর সুস্থতার সম্পর্ক
আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয়, সফর মাসের শেষ বুধবার রাসূল (সা.) অসুস্থতার মধ্যে কিছুটা সুস্থতা অনুভব করেছিলেন। এরপর তিনি গোসল করেন এবং নামাজের সঙ্গে যুক্ত হন—এমন কথাও বিভিন্ন প্রচলিত গ্রন্থে পাওয়া যায়।
কিন্তু এসব বর্ণনার তারিখ ও সনদ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতা ঠিক কোন দিন শুরু হয়েছিল এবং কতদিন স্থায়ী হয়েছিল—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোতে মতভেদ রয়েছে।
তাই কোনো একটি নির্দিষ্ট বুধবারকে নিশ্চিতভাবে তাঁর সুস্থতার দিন বলা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সাহাবিদের আমলে কি আখেরি চাহার সোম্বা পালন করা হয়েছিল?
এখানেই বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা দেখা যায়।
ইসলামি গবেষকদের একটি অংশের মতে, রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম এই দিনটিকে আলাদা ধর্মীয় দিবস হিসেবে পালন করেছেন—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, উপমহাদেশের কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথায় দিনটির সঙ্গে দান-সদকা ও নফল ইবাদতের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে।
সুতরাং আখেরি চাহার সোম্বার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রচলন এবং এ দিনটির বিশেষ ধর্মীয় ফজিলতের প্রামাণ্যতা—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আরও পড়ুন: তেজপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা
জাদুর প্রভাব কাটার সঙ্গে কি আখেরি চাহার সোম্বার সম্পর্ক আছে?
রাসূল (সা.)-এর ওপর জাদুর ঘটনা নিয়ে সহিহ হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। তবে সেই ঘটনাকে সফর মাসের শেষ বুধবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এ কারণে ‘সফর মাসের শেষ বুধবারে জাদুর প্রভাব সম্পূর্ণভাবে কেটে গিয়েছিল’—এমন বক্তব্যকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।
আরও পড়ুন: তেজপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে আলোচনা করার সময় দুটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার।
প্রথমত, রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর অসুস্থতার সময় নামাজ, সাহাবিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং শেষ সময়ের ঘটনাগুলো সহিহ হাদিসে সংরক্ষিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কোনো নির্দিষ্ট দিনকে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ মর্যাদা দিতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত কোনো সামাজিক রীতি এবং সরাসরি সুন্নাহ—দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন: কাঁচা মরিচ খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
পাঠকের জন্য মূল তথ্য
- আখেরি চাহার সোম্বা বলতে সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝানো হয়।
- দিনটির সঙ্গে রাসূল (সা.)-এর অসুস্থতার সময় সাময়িক সুস্থতার একটি প্রচলিত বর্ণনা যুক্ত রয়েছে।
- রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুস্থতার বিস্তারিত ঘটনা সহিহ হাদিসে পাওয়া যায়।
- তাঁর শেষ অসুস্থতার নির্দিষ্ট আধুনিক চিকিৎসাগত রোগের নাম নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
- সহিহ বুখারিতে তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় আবু বকর (রা.)-এর ইমামতির বর্ণনা রয়েছে।
- শেষ অসুস্থতার সময় রাসূল (সা.) গুরুতর শারীরিক দুর্বলতার মধ্যে ছিলেন।
- সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ ধর্মীয় আমলের নির্দিষ্ট দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
- কোনো ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় বক্তব্য প্রচারের আগে তার সূত্র ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
FAQ
১. আখেরি চাহার সোম্বা কী?
সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার সোম্বা বলা হয়। মুসলিম সমাজের একটি অংশ দিনটিকে রাসূল (সা.)-এর অসুস্থতার সময়কার একটি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে থাকে।
২. আখেরি চাহার সোম্বা কোন মাসে হয়?
হিজরি ক্যালেন্ডারের সফর মাসের শেষ বুধবারে আখেরি চাহার সোম্বা পালনের প্রচলন রয়েছে।
৩. রাসূল (সা.)-এর শেষ অসুখ কী ছিল?
প্রামাণ্য হাদিসে তাঁর শেষ অসুস্থতার বিভিন্ন লক্ষণ ও শারীরিক কষ্টের কথা পাওয়া যায়। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট কোনো রোগের নাম দিয়ে তাঁর শেষ অসুস্থতাকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা যায় না।
৪. রাসূল (সা.) কি অসুস্থ অবস্থায় নামাজ আদায় করেছিলেন?
হ্যাঁ। তাঁর শেষ অসুস্থতার সময় নামাজের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার একাধিক বর্ণনা সহিহ হাদিসে রয়েছে। এক পর্যায়ে আবু বকর (রা.) মুসল্লিদের ইমামতি করেন এবং রাসূল (সা.) অসুস্থ অবস্থায় নামাজের বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
৫. আখেরি চাহার সোম্বা কি ইসলামে নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব?
এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। দিনটিকে বিশেষ ধর্মীয় দিবস বা নির্দিষ্ট আমলের দিন হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে প্রামাণ্য দলিল আছে কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেম ও প্রামাণ্য ইসলামি উৎসের বক্তব্য অনুসরণ করা উচিত।
উপসংহার
আখেরি চাহার সোম্বা দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিনের একটি প্রচলিত ধর্মীয়-সামাজিক ধারণা। এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসুস্থতার সময়কার কিছু বর্ণনা যুক্ত থাকলেও সফর মাসের শেষ বুধবারেই তিনি বিশেষভাবে সুস্থ হয়েছিলেন—এমন নির্দিষ্ট প্রমাণকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন।
অন্যদিকে, তাঁর শেষ অসুস্থতার ঘটনা সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। সেখানে তাঁর গুরুতর অসুস্থতা, নামাজের প্রতি গুরুত্ব এবং শেষ দিনের ঘটনাগুলোর বিবরণ পাওয়া যায়।
তাই আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে প্রচলিত বিশ্বাস, ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং সহিহ হাদিস—এই তিনটির পার্থক্য স্পষ্ট রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।