পাইকগাছায় তীব্র লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত
খুলনার পাইকগাছায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় পাইকগাছায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক দিন ধরে দিনে ও রাতে বিভিন্ন সময়ে মিলিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গরমের মধ্যে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বেড়েছে, তেমনি বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা, মাছ সংরক্ষণ, মিল-কলকারখানা ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে উপজেলায় দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট, সেখানে গত দুই দিন ধরে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট।
চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেক কম

খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, সেচ ও শিল্পসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ১ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে সচল গ্রাহক প্রায় ৮৫ হাজার।
এই বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক দুই দিনে সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পাইকগাছা জোনের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) অঞ্জন কুমার সরকারও সরবরাহ ঘাটতির বিষয়টি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ বাড়াতে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
দিনে-রাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। দিনের পাশাপাশি রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা হচ্ছে।
বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ বাড়ছে। ঘুম, পানি তোলা, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র চার্জ দেওয়া এবং ঘরের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে এত দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের ঘটনা তারা খুব কমই দেখেছেন।
মাছ ব্যবসায় বাড়ছে সংকট
পাইকগাছার স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে মাছ চাষ, মাছের আড়ত ও পরিবহন কার্যক্রম ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তাই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এই খাতেও সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে বরফকলগুলোতে পর্যাপ্ত বরফ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য বরফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা বাড়তি সমস্যায় পড়ছেন।
পাইকগাছা মৎস্য আড়ৎদারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল মোড়লের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফকল স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনের সময়ে বরফ না পাওয়ায় মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
একইভাবে স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, বরফের সংকটের কারণে তাদের অতিরিক্ত দামে বরফ কিনতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার খরচও বাড়ছে।
মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
মাছ দ্রুত সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বরফ না পাওয়া গেলে ব্যবসায়ীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎ সংকট শুধু বরফ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থাতেও পড়ছে।
মিল-কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
পাইকগাছার বিভিন্ন ধান, চাল ও তেল মাড়াইয়ের মিলসহ ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নিয়মিত উৎপাদন চালাতে পারছে না।
বিদ্যুৎ না থাকলে যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ কখন আসবে, সেটি নিশ্চিত না থাকায় উৎপাদনের পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাও নষ্ট হচ্ছে।
গোপালপুর এলাকার নাহিদ হাসান রাইস মিলের মালিক আমিনুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে মিল নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে বলে তিনি জানান।
মিলের শ্রমিক শফিকুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ না থাকলে মিল বন্ধ থাকে এবং তখন শ্রমিকদের কাজও থাকে না। ফলে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং তাদের আয়ের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
বাজার ও ছোট ব্যবসায়ও প্রভাব
লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে পাইকগাছার স্থানীয় বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং, অনলাইন সেবা, মোবাইল ও ইলেকট্রনিকসের দোকানের মতো বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসায় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে। বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠছে।
কেন এত বেশি লোডশেডিং হচ্ছে?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ হলো চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় ঘাটতি।
পাইকগাছায় যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে সাম্প্রতিক দুই দিনে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
তবে সরবরাহ ঘাটতির মূল কারিগরি বা জাতীয় পর্যায়ের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো কারণ উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
আরও পড়ুন: কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?
পাইকগাছায় তীব্র লোডশেডিং এখন শুধু বাসাবাড়ির সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে।
প্রধান সমস্যাগুলো হলো—
- দিনে ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকা
- গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ
- পানি তোলার মোটর চালাতে সমস্যা
- মোবাইল ফোন ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র চার্জে সমস্যা
- বরফকলের উৎপাদন কমে যাওয়া
- মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে জটিলতা
- মাছ ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে যাওয়া
- ধান, চাল ও তেল মাড়াইয়ের মিলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া
- শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া
- দোকান ও ছোট ব্যবসায় বিক্রি কমে যাওয়ার আশঙ্কা
- জেনারেটর ব্যবহারে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়
পাইকগাছার বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিদ্যুৎ এখন শুধু ঘরবাড়ির আলো বা ফ্যান চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা নয়। স্থানীয় অর্থনীতির অনেক কার্যক্রম সরাসরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
পাইকগাছার ক্ষেত্রে মাছ সংরক্ষণ, বরফ উৎপাদন, কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক ব্যবসা, চালকল এবং বিভিন্ন ছোট শিল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। তাই দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ সংকট চলতে থাকলে এর প্রভাব ব্যক্তি পর্যায় থেকে ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে মাছ সংরক্ষণে বরফের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্য বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন কী হতে পারে?
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরবরাহ বাড়ানো না গেলে বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যুৎ দেওয়া কঠিন। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরবরাহ বৃদ্ধিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
স্থানীয় গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন।
আরও পড়ুন: কাঁচা মরিচ খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
পাঠকের জন্য মূল তথ্য
- স্থান: পাইকগাছা, খুলনা
- চাহিদা: প্রায় ১৮ মেগাওয়াট
- সাম্প্রতিক সরবরাহ: প্রায় ৩–৪ মেগাওয়াট
- গ্রাহক: প্রায় ১ লাখ
- সচল গ্রাহক: প্রায় ৮৫ হাজার
- মূল সমস্যা: চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহের বড় ঘাটতি
- প্রভাবিত খাত: বাসাবাড়ি, মাছ ব্যবসা, বরফকল, মিল-কলকারখানা ও স্থানীয় ব্যবসা
- স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন
FAQ
১. পাইকগাছায় এত লোডশেডিং কেন হচ্ছে?
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কমে যাওয়ায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
২. পাইকগাছায় প্রতিদিন কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন?
পাইকগাছা জোনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে।
৩. বর্তমানে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া গেছে।
৪. লোডশেডিংয়ে মাছ ব্যবসায়ীদের সমস্যা কী?
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফকলগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। এতে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় বরফের সংকট তৈরি হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে।
৫. বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কী প্রয়োজন?
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়া পর্যন্ত চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া কঠিন।
উপসংহার
খুলনার পাইকগাছায় বিদ্যুতের সরবরাহ ও চাহিদার বড় ব্যবধানের কারণে তৈরি হয়েছে তীব্র লোডশেডিং। দিনে-রাতে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মাছ ব্যবসায়ী, বরফকল, মিল-কলকারখানা ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সমস্যায় পড়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো গেলে জনদুর্ভোগ কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্বাভাবিক করা সম্ভব হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।