জুলাইয়ে কমল মূল্যস্ফীতি
টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাইয়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, জুলাই ২০২৬ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর আগে জুনে এই হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কমেছে ০ দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে এসেছে—এমনটি বলা যাচ্ছে না। কারণ একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
জুলাইয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কত?
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতিও কমেছে। জুলাইয়ে এ হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, যেখানে জুনে ছিল ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভয়—দুই খাতেই মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে।
| সূচক | জুন ২০২৬ | জুলাই ২০২৬ |
|---|---|---|
| সাধারণ মূল্যস্ফীতি | ৯.১৬% | ৮.৩২% |
| খাদ্য মূল্যস্ফীতি | ৮.৬০% | ৭.১৬% |
| খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি | ৯.৬১% | ৯.২৮% |
মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ কী?
মূল্যস্ফীতির হার কমেছে মানেই বাজারের সব পণ্যের দাম কমে গেছে—এমন নয়। সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে।
তাই কোনো পণ্যের দাম আগের মাসের তুলনায় কমতে পারে, আবার অনেক পণ্যের দাম একই অবস্থায় থাকতে পারে বা বাড়তেও পারে। এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
আরও পড়ুন: কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা
তিন মাস পর ৯ শতাংশের নিচে মূল্যস্ফীতি

সাম্প্রতিক মাসগুলোর তথ্য দেখলে মূল্যস্ফীতির ওঠানামার বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। জুনে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, মে মাসে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং এপ্রিলে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ছিল। এর আগে মে মাসের হার ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হার তাই গত কয়েক মাসের তুলনায় স্বস্তির ইঙ্গিত দিলেও মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।
জ্বালানি ও পরিবহন খরচের প্রভাব
মূল্যস্ফীতির পেছনে বিভিন্ন ধরনের কারণ কাজ করতে পারে। এর মধ্যে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জ্বালানি খরচ বাড়লে পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার ব্যয়ও বাড়তে পারে। এর প্রভাব সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে জুলাইয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে খাদ্য মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য পতন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আরও পড়ুন: তেজপাতার উপকারিতা ও অপকারিতা
মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি মানুষের আয় বা মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থাৎ গড় হিসাবে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল। এর অর্থ, গড় মজুরি ও দামের পরিবর্তনের মধ্যে এখনো পুরোপুরি সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি।
মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় ধীরগতিতে বাড়লে একই পরিমাণ আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হতে পারে। অর্থনীতিতে এটিই প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরির অন্যতম দিক।
সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় দৈনন্দিন খরচের ক্ষেত্রে। খাদ্য, যাতায়াত, বাসস্থান, চিকিৎসা, পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়লে পরিবারের মাসিক বাজেটও চাপের মুখে পড়ে।
বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট বা সীমিত, তাদের জন্য পণ্যের দাম ও আয়ের বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফলে পরিবারের অনেককে খরচের অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে হতে পারে। কেউ প্রয়োজনীয় নয় এমন ব্যয় কমাতে পারেন, আবার কেউ সঞ্চয় কমিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে পারেন।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি

সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫–২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হার এই গড়ের তুলনায় কিছুটা কম।
তবে একটি মাসের তথ্য দিয়ে মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পরবর্তী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কোন দিকে যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতির তথ্য গুরুত্বপূর্ণ?
জুলাই মাস দিয়ে নতুন অর্থবছরের শুরু হয়েছে। তাই বছরের শুরুতেই মূল্যস্ফীতির হার কমে আসার বিষয়টি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে আসায় বাজারের দামের চাপ কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টি নজরে রাখা প্রয়োজন।
পাঠকের জন্য মূল তথ্য
- জুলাই ২০২৬-এ সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৩২ শতাংশ।
- জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১৬ শতাংশ।
- জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৭.১৬ শতাংশ।
- খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯.২৮ শতাংশ।
- জুলাইয়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.২২ শতাংশ।
- ২০২৫–২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৮ শতাংশ।
- মূল্যস্ফীতি কমেছে মানেই সব পণ্যের দাম কমেছে—এমন নয়।
- আয় বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
FAQ
১. জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি কত ছিল?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
২. জুনের তুলনায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কত কমেছে?
জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুলাইয়ে তা ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ এক মাসে ০ দশমিক ৮৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে।
৩. জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কত ছিল?
জুলাই ২০২৬-এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। জুনে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ।
৪. মূল্যস্ফীতি কমলে কি বাজারে সব পণ্যের দাম কমে যায়?
না। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ সাধারণত পণ্যের দাম বৃদ্ধির গতি কমেছে। এর অর্থ সব পণ্যের দাম আগের তুলনায় কমে গেছে—এমন নয়।
৫. মজুরি বৃদ্ধির হার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মজুরি বা আয় কতটা বাড়ছে, সেটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মূল্যস্ফীতি যদি আয় বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
উপসংহার
টানা তিন মাস ৯ শতাংশের ওপরে থাকার পর জুলাইয়ে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ হওয়া সামগ্রিক হারে পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি কতটা ফিরেছে, তা শুধু এই একটি সূচক দিয়ে বিচার করা যায় না। মজুরি বৃদ্ধির হার, নিত্যপণ্যের দাম এবং সামনের মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির গতিপথও গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন অর্থবছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি কমার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।